Skip to main content

রাজমহলের যুদ্ধ, বাংলায় মুঘল শাসন ও মধ্যযুগ

 রাজমহলের যুদ্ধ  বাংলার ইতিহাসে অন্যতম নিষ্পত্তিমূলক যুদ্ধ। এই যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলায় মুগল শাসনের সূত্রপাত হয়।।


১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দে হোসেনশাহী বংশের শেষ সুলতান গিয়াসউদ্দীন মাহমুদ শাহের পতনের মাধ্যমে বাংলার স্বাধীন সালতানাতের সমাপ্তি ঘটে। মুগল সম্রাট হুমায়ুন রাজধানী গৌড় অধিকার করেন। অবশ্য তিনি তা বেশি দিন নিজের দখলে রাখতে পারেন নি। চৌসার (১৫৩৯ খ্রি) যুদ্ধে শূর বংশীয় আফগান শেরশাহ বাংলার অধিপতি হন। বাংলায় এই আফগান আধিপত্য প্রায় পঁচিশ বছর (১৫৩৮-১৫৬৩ খ্রি) স্থায়ী হয়।।


কররানী বংশের উত্থানের মাধ্যমে বাংলা পুনরায় তার স্বাধীনতা ফিরে পায়। কররানী বংশের শেষ সুলতান দাউদ খান কররানী তাঁর পিতার মতো আকবরের প্রভুত্ব মেনে না নিয়ে নিজের নামে মুদ্রাঙ্কণ এবং খুতবা পাঠ করেন। এছাড়া, আরও অন্যান্য কারণে তাঁকে মুগল আক্রমণের মোকাবিলা করতে হয় এবং তুকারই (১৫৭৫ খ্রি) যুদ্ধে তিনি মুনিম খান কর্তৃক পরাজিত হন। শত্রুতার সমাপ্তি ঘটে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দের ১২ এপ্রিল সম্পাদিত কটক চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তি অনুসারে দাউদ খান কার্যত বাংলা ও বিহারের প্রায় সম্পূর্ণটাই মুগল অধিকারে ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। শুধু উড়িষ্যাই তখন তাঁর ক্ষমতাধীন থাকে।


কিন্তু কটক চুক্তি বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। মুনিম খানের মৃত্যুর পর দাউদ খান কররানী তাঁর হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারের অভিলাষে উড়িষ্যা ছেড়ে বের হন এবং প্রায় তেলিয়াগড়ি পর্যন্ত পুনর্দখল করেন। অবশিষ্ট মুগল কর্মকর্তাগণও গৌড় ও তান্ডা ত্যাগ করেন এবং পাটনার দিকে দ্রুত অগ্রসর হন। এভাবে দাউদ খান পুনরায় উড়িষ্যাসহ পশ্চিম ও উত্তর বাংলার অধিপতি হন। পূর্ব বাংলা ছিল তখন ঈসা খান ও তাঁর মিত্রদের অধিকারে। ঈসা খান ইতোমধ্যে শাহ বর্দির নেতৃত্বে মুগল নৌ-বহরকে বাংলা থেকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হন।


সুতরাং আবারও শত্রুতার সূত্রপাত ঘটে এবং দাউদ খানের হাত থেকে বাংলা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে আকবর খান-ই-জাহান (আকবর কর্তৃক প্রদত্ত উপাধি) হোসেন কুলী বেগকে দায়িত্ব দেন। অন্যদিকে দাউদ খানও তাঁর প্রস্ত্ততি সম্পন্ন করেন এবং কালাপাহাড়, জুনায়েদ ও কুতলু খানের সহযোগিতায় তাঁর সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেন। এই আফগান নেতারা কখনই কটক চুক্তিকে স্বীকৃতি দেন নি। দাউদ খান তেলিয়াগড়িতে তিন হাজার সেরা আফগান সৈন্য সমবেত করেন এবং তিনি নিজে রাজমহলের পাহাড় ও গঙ্গার মধ্যবর্তী অপ্রশস্ত এলাকায় বাকি সৈন্য-সামন্তসহ অবস্থান নেন।


হোসেন কুলী বেগ তেলিয়াগড়িতে আফগানদের সম্মুখীন হন। উভয়পক্ষে প্রচন্ড যুদ্ধ শুরু হয়। প্রায় অর্ধেক আফগান সৈন্য যুদ্ধে মারা যায়। ফলস্বরূপ তেলিয়াগড়ি হোসেন কুলী বেগের অধীন হয়। এরপর তিনি দাউদ খানের উদ্দেশ্যে রাজমহলের দিকে অগ্রসর হন। আফগানগণ দৃঢ় ও সংঘবদ্ধভাবে মুগলদের প্রতিরোধ করে। তাদেরকে স্থানচ্যুত করা সহজ ছিল না। অন্যদিকে মুগলদের নানা রকম বাধা-বিঘ্ন মোকাবিলা করতে হচ্ছিল। মুগল শিবিরে শিয়া-সুন্নী দ্বন্দ্ব, মৌসুমী জলবায়ুর আগমনে আবহাওয়া-সংক্রান্ত সমস্যা এবং সবার উপরে খাদ্য ও অস্ত্র সরবরাহের ঘাটতি মুগল বাহিনীকে সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছিল।


খান-ই-জাহান হোসেন কুলী বেগ প্রায় চার মাস রাজমহল অবরোধ করে রাখেন। এরই মধ্যে সম্রাটের নির্দেশে বিহারের গভর্নর মোজাফ্ফর খান তুরবতি পাঁচ হাজার ঘোড়-সওয়ার এবং নৌকা বোঝাই খাদ্য ও গোলাবারুদ নিয়ে খান-ই-জাহানের সহায়তায় রাজমহলে উপস্থিত হন।


বর্ধিত শক্তি নিয়ে মুগলরা ১৫৭৬ খ্রিস্টাব্দের ১২ জুলাই (১৫ রবি-উস-সানি, ৯৮৪ হিজরি) রাজমহলে আফগানদের মুখোমুখি হয়। দাউদ খান নিজে সৈন্যবাহিনীর মধ্যভাগ, জুনায়েদ বাম অংশ এবং কালাপাহাড় ডান দিকের নেতৃত্ব দেন। অগ্রভাগের নেতৃত্বে থাকেন কুতলু খান। জুনায়েদ কামানের গোলার আঘাতে নিহত হন। জুনায়েদের মৃত্যু দাউদ বাহিনীর মনোবল ভেঙ্গে দেয় এবং তারা যুদ্ধক্ষেত্র ছেড়ে পালিয়ে যায়। কালাপাহাড় এবং কুতলু খান পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও, দাউদ খানের ঘোড়া কাদায় আটকে যাওয়াতে তিনি ধরা পড়েন ও বন্দি হন। খান-ই-জাহানের দৃষ্টিতে সকল বিশৃঙ্খলা ও বিদ্রোহের মূলে ছিলেন দাউদ খান। তাই খান-ই-জাহান তাঁর মৃত্যুদন্ড দ্রুত কার্যকর করার আদেশ দেন।


দাউদ খানের মৃত্যুর মাধ্যমে রাজমহলের যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে এবং বাংলায় আফগান শাসন শেষ হয়ে মুগল শাসনের সূত্রপাত হয়। কিন্তু বারো ভূঁইয়াদের প্রধান ঈসা খানের নেতৃত্বে আফগান প্রতিরোধ আরও প্রায় ত্রিশ বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। দাউদ খানের পরাজয় ও মৃত্যু মুগলদের একজন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ও অসামান্য আফগান প্রতিদ্বন্দ্বীর সমাপ্তি ঘটায় ঠিকই, কিন্তু এর ফলে বাংলায় মুগলদের নিরঙ্কুশ অধিকার সূচিত হয়নি, কিংবা এই যুদ্ধ বাংলায় আফগান প্রতিরোধের সমাপ্তিও ছিল না। 


Comments

Popular posts from this blog

পৃথিবীর কাল্পনিক রেখাসমূহ |

 ::: সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে কোনো একটি স্থানকে নির্দিষ্ট করতে হলে বা এর অবস্থান জানতে হলে আমাদের সবার জাগে যে বিষয়গুলো জানতে হবে তা হলো অক্ষরেখা ও দ্রাঘিমারেখা। দ্রাঘিমারেখার অবস্থান থেকে কোনো স্থানের সময় জানা যায়। অক্ষরেখার সাহায্যে যেমন নিরক্ষরেখা থেকে উত্তর বা দক্ষিণে অবস্থান জানা যায় তেমনি মূল মধ্যরেখা থেকে পূর্ব বা পশ্চিমে অবস্থান জানা যায়।   °°অক্ষরেখা (Latitude) পৃথিবীর গোলাকৃতি কেন্দ্র দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে কল্পিত রেখাকে অক্ষ (Axis) বা মেরুরেখা বলে। এই অক্ষের উত্তর- প্রান্ত বিন্দুকে উত্তর মেরু বা সুমেরু এবং দক্ষিণ-প্রান্ত বিন্দুকে দক্ষিণ মেরু বা কুমেরু বলে। দুই মেরু থেকে সমান দূরত্বে পৃথিবীকে পূর্ব-পশ্চিমে বেষ্টন করে একটি রেখা কল্পনা করা হয়েছে। একে নিরক্ষরেখা বা বিষুবরেখা বলে। বিষুবরেখা নিরক্ষরেখা, নিরক্ষবৃত্ত, মহাবৃত্ত, গুরুবৃত্ত প্রভৃতি নামেও পরিচিত। বিষুবরেখা দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরভাগ, আফ্রিকার মধ্যভাগ দিয়ে অতিক্রম করেছে। বিষুব রেখার উপর অবস্থিত দেশসমূহ- ইকুয়েডর, কলম্বিয়া, ব্রাজিল, গ্যাবন, কঙ্গো, গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো, উগান্ডা, কেনিয়া, সোমালিয়া, মালদ্বীপ, ইন্দোনেশিয়া এব...

বিগত ১০ বছরের বিভিন্ন পরীক্ষায় আসা ১০০০ Vocabulary.

 =============================== 1: Fortuitous -আকস্মিক 2: Inherent – স্বাভাবিক 3: Legible -সহজপাঠ্য 4: Indelible -অমোচোনীয় 5: Endurable -সহনীয় /টেকসই 6: gregarious -মিশুক /সামাজিক 7: Introverted -অন্তর্মুখী ব্যক্তি (আত্মকেন্দ্রিক চিন্তা চেতনা ) 8: Alleviate -উপশম করা 9: Aggravate -অধিক গুরুতর/ শোচনীয় করে তোলা 10: Elevate -উত্তোলন করা,উন্নীত করা 11: Desultory -নিয়মশৃংখলাহীন 12: Methodical -সুশৃংখল 13: Integral -অপরিহার্য অংশ 14: Dissipate – দূর করা/অপচয় করা 15: Exempt -রেহাই /অব্যহতি দেয়া 17: Obliged -বাধিত বা ঋণী হয়েছে এমন 18: Steadfast -অবিচলিত 19: Valiant -সাহসী 20: Repute -সুখ্যাতি 21: Susceptible -স্পর্শকাতর 22: opaque- অস্বচ্ছ 24: Tepid -অল্প গরম বা কুসুম কুসুম গরম 25: Seething -ফুটে উপচে পড়া এমন 26: Intimate -অন্তরঙ্গ 27: Turbid – ঘোলাটে 28: Swollen – ফোলা বা ফুলে যাওয়া 29: Accretion -সংযোজনের মাধ্যমে বৃদ্ধি 30: Procession : মিছিল বা শোভাযাত্রা 31: Applaud -প্রশংসা 32: Evasion -এড়িয়ে যাওয়া 33: Transmit -প্রেরণ বা হস্তান্তর করা 34: Obscure -অন্ধকার 35: Withhold -প...

সহজে ইংরেজি বাক্য গঠন ও কথা বলার উপায়

ইংরেজিতে অনর্গল কথা বলতে নিচের Structures গুলো জানা খুবই গুরুত্বপূর্ণ: ★RULE:1 কোনো কিছু প্রয়োজন বুঝাতে,  আমরা need to use করব। sub+need to+verb1 I need to learn English. আমার ইংরেজি শিখা প্রয়োজন। I need to buy a book. আমার একটি বই কিনা প্রয়োজন। I need to help him. আমার তাকে সাহায্য করা প্রয়োজন। I need to do the work. আমার কাজটি করা প্রয়োজন। ★RULE:2 ☞I am having a hard time+ ing যুক্ত verb(কোন কিছু করতে সমস্যা হচ্ছে) 1.I am having a hard time understanding my friends.( আমার বন্ধুদের বুঝতে আমার সমস্যা হচ্ছে ) 2.I am having a hard time downloading songs.( আমার গান গুলি ডাউনলোড করতে সমস্যা হচ্ছে) 3..I am having a hard time answering your questions.( তোমার প্রশ্নগুলির উত্তর দিতে আমার সমস্যা হচ্ছে)। Similarly, I am having a hard time understanding the rules. I am having a hard time browsing internet. ★ RULE:3 ☞There is something wrong with + noun.( কোন কিছুতে সমস্যা হয়েছে) 1. There is something wrong with computer.(আমার কম্পিউটার এ সমস্যা হয়েছে) 2. There is something wrong with my mobi...